ক্র্যাডলে রাখা মন | নব্বই দশকের ল্যান্ডফোনের মিষ্টি প্রেমের গল্প

samgraphic222
0



নব্বই দশকের সেই ল্যান্ডফোনের যুগ, ক্যাসেটের ফিতায় প্রিয় গান রেকর্ড করা আর একটা চিঠির জন্য দিন গুনার নস্টালজিয়া মাখানো একটি মিষ্টি প্রেমের গল্প:


ক্র্যাডলে রাখা মন

১. ট্রিং ট্রিং এবং একটি অচেনা কণ্ঠ


নব্বই দশকের শেষ দিক। বিকেল হলেই অনিকের ঘরের কোণে রাখা লাল রঙের টিএনটি ল্যান্ডফোনটার দিকে চোখ যেত। তখন মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটের যুগ ছিল না। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি, নয়তো এই ল্যান্ডফোন। তাও সবার ঘরে ফোন থাকত না, পুরো মহল্লায় হাতে গোনা কয়েকটা বাড়িতে থাকত।

অনিক তখন অনার্সের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। একদিন দুপুরে ঘরে কেউ ছিল না, অনিক একটা গল্পের বই পড়ছিল। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল—'ট্রিং ট্রিং... ট্রিং ট্রিং'।

অনিক অলস পায়ে হেঁটে গিয়ে রিসিভারটা কানে তুলল, "হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।"

ওপাশ থেকে কোনো ছেলের গলা নয়, ভেসে এল এক মায়াবী, মিষ্টি মেয়ের কণ্ঠ, "হ্যালো, সুমি আছিস? তোকে কখন থেকে ট্রাই করছি বলতো!"

অনিক বুঝতে পারল নম্বর ভুল হয়েছে। সে একটু হেসে বলল, "জি না, এখানে কোনো সুমি নেই। এটা ভুল নম্বর।"

ওপাশ থেকে মেয়েটি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "ওহ, সরি!" ব্যস, খট করে ফোনটা কেটে গেল।

অনিক রিসিভারটা নামিয়ে রাখল, কিন্তু সেই মিষ্টি কণ্ঠটা তার মাথায় কেমন যেন গেঁথে রইল।

২. ভুল নম্বরের সূত্র ধরে


ঠিক দুদিন পর, আবার ঠিক একই সময়ে ফোনটা বেজে উঠল। অনিক এবার একটু দ্রুতই গেল। রিসিভার তুলতেই ওপাশ থেকে সেই একই কণ্ঠ, "হ্যালো, সুমি?"

অনিক এবার গলাটা একটু গম্ভীর করে বলল, "আপনাকে তো সেদিনও বললাম, এটা সুমিদের বাসা নয়। আপনি একটু নম্বরটা মিলিয়ে ডায়াল করুন।"

ওপাশ থেকে মেয়েটি এবার দমে না গিয়ে উল্টো চটে গেল, "আরে, আমি তো ঠিক নম্বরই ঘোরাচ্ছি। ২-৪-৪-১-১... ওহ আচ্ছা, শেষের ডিজিটটা ভুল হয়েছে। আই অ্যাম সো সরি। আসলে এই ডায়াল প্যাডগুলো বড্ড শক্ত।"

অনিকের হুট করেই মেয়েটির সাথে কথা বাড়াতে ইচ্ছে হলো। সে বলল, "তা তো বুঝলাম। কিন্তু আপনার এই শক্ত ডায়াল প্যাডের চক্করে আমার দুদিনের দুপুরের ঘুমটা যে ভাঙল, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?"

মেয়েটি একটু দমে গেল, তারপর ফিসফিস করে বলল, "আচ্ছা বাবা, আর কোনোদিন ভুল হবে না। সত্যি সরি।"

"ঠিক আছে, এবারের মতো মাফ করা হলো। তা আপনার নামটা কী জানা যাবে?" অনিক সাহস করে জিজ্ঞেস করেই ফেলল।

ওপাশ থেকে একটু নীরবতা। তারপর ল্যান্ডফোনের খসখসে লাইনে ভেসে এল একটা নাম—"নীলা।"

৩. চার দেওয়ালে বন্দি প্রেম


সেই ভুল নম্বরের সূত্র ধরেই শুরু হলো এক অদ্ভুত অধ্যায়। প্রতিদিন ঠিক দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটে—যখন অনিকের আর নীলার দুজনের বাড়ির বড়রা ঘুমে কাদা, তখন ল্যান্ডফোনের ডায়াল প্যাড ঘুরে উঠত।

নব্বই দশকের প্রেমের একটা বড় থ্রিল ছিল এই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। বসার ঘরে বা করিডোরে রাখা ফোনটায় কথা বলার সময় সবসময় চোখ থাকত বাবা-মায়ের ঘরের দরজার দিকে। একটু পায়ের আওয়াজ পেলেই খট করে রিসিভারটা ক্র্যাডলে নামিয়ে রাখতে হতো। আর বুকটা দুরুদুরু কাঁপত।

তারা কেউ কাউকে দেখেনি। অনিক শুধু জানত নীলা ইডেন কলেজে পড়ে, তার চুলে দুটো বেণি আর সে গান শুনতে ভালোবাসে। আর নীলা জানত অনিক নীল শার্ট পরতে পছন্দ করে আর লুকিয়ে কবিতা লেখে।

একদিন রাতে অনিক ক্যাসেট প্লেয়ারের পাশে ল্যান্ডফোনের রিসিভারটা ধরে রাখল। ওপাশে নীলা কান পেতে শুনছিল অনিকের রেকর্ড করা অঞ্জন দত্তের "তুমি না থাকলে" গানটি। গানের লাইনের সাথে সাথে দুজনের হৃদস্পন্দন যেন এক হয়ে যাচ্ছিল। তারের মাধ্যমে বয়ে যাওয়া সেই কণ্ঠস্বরই ছিল তাদের পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি।

৪. প্রথম দেখার বিকেল


দেখতে দেখতে ছ’টা মাস কেটে গেল। শুধু ফোনেই সীমাবদ্ধ রইল তাদের পৃথিবী। অবশেষে একদিন নীলা বলল, "আচ্ছা, আমরা কি কোনোদিন সামনাসামনি দেখা করব না?"

অনিকের বুকটা ধক করে উঠল। সে বলল, "চলো, আগামী শুক্রবার বিকেলে রমনা পার্কের লেকের পাড়ে। আমার পরনে থাকবে নীল শার্ট, আর হাতে থাকবে একটা চয়নিকার গল্পের বই।"

নীলা মৃদু হেসে বলল, "আমি নীল পাড়ের একটা সাদা শাড়ি পরব। আর হাতে থাকবে একটা লাল গোলাপ।"

শুক্রবার বিকেলটা যেন কাটতেই চাইছিল না। অনিক ৩টার মধ্যেই রমনা পার্কে হাজির। অস্থির হয়ে সে লেকের পাড়ে হাঁটছিল। ঠিক সাড়ে তিনটায় দূর থেকে একটা মেয়েকে হেঁটে আসতে দেখল। সাদা শাড়ি, নীল পাড়, চুলে একটা খোপার মাঝে গোঁজা লাল গোলাপ। মেয়েটি দেখতে ঠিক যেমন অনিক কল্পনায় এঁকেছিল—শান্ত, মায়াবী আর ভীষণ সুন্দর।

নীলা অনিকের সামনে এসে দাঁড়াল। অনিকের হাতের বই আর নীল শার্ট দেখে সে চিনতে পারল। দুজন দুুজনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কোনো কথা নেই, ল্যান্ডফোনের সেই খসখসে আওয়াজ নেই, শুধু এক জোড়া চোখের মৌনতা।

নীলা প্রথম নীরবতা ভেঙে বলল, "ফোনে তো অনেক কথা বলো, এখন চুপ কেন?"

অনিক পকেট থেকে তার ডায়েরিটা বের করে নীলার হাতে দিল। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা:


"যে কণ্ঠের প্রেমে পড়েছিলাম তারে,

আজ পূর্ণতা পেলাম এই রমনার পাড়ে।"

নীলা ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে ধরল। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে তাদের মনে হলো, ল্যান্ডফোনের সেই 'ট্রিং ট্রিং' শব্দটা যেন আজ তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সুর হয়ে বেজে উঠেছে। নব্বই দশকের সেই তারের ওপার থেকে শুরু হওয়া প্রেমটা সেদিন রমনা পার্কের ঘাসে স্থায়ী রূপ নিল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top