সর্বশেষ

সিন্দাবাদের ৭টি রোমাঞ্চকর অভিযান: আরব্য রজনীর রূপকথার গল্প Sindbad Story

 

সিন্দাবাদের ৫টি রোমাঞ্চকর অভিযান: ছোটদের রূপকথার গল্প


আরব সাগরের তীরের রূপকথার নগরী বাগদাদ। সেখানে বাস করতেন এক দুঃসাহসী নাবিক—সিন্দাবাদ। অজানাকে জানার আর নতুন নতুন দ্বীপ আবিষ্কারের নেশায় তিনি বারবার ছুটে যেতেন উত্তাল সমুদ্রে। আরব্য রজনী বা আলিফ লায়লার গল্পে সিন্দাবাদের সেই রোমাঞ্চকর সাতটি অভিযানের কথা বলা হয়েছে। আজ আমরা জানবো সিন্দাবাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি অভিযানের গল্প, যা ছোট-বড় সবার মনে রোমাঞ্চ জাগাবে।

 চলো, সিন্দাবাদের সাথে আমরাও ভেসে পড়ি উত্তাল সাগরে!


১. প্রথম অভিযান: দ্বীপ যখন জ্যান্ত তিমি মাছ!

অনেক দিন আগের কথা। বাগদাদ শহরে সিন্দাবাদ নামে এক তরুণ নাবিক বাস করত। তার বাবা ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সিন্দাবাদ সব টাকা-পয়সা উড়িয়ে দিয়ে প্রায় গরিব হয়ে পড়ল। তখন তার মনে হলো, এভাবে বসে থাকলে চলবে না, তাকে কিছু করতে হবে। সিন্দাবাদ তার শেষ সম্বলটুকু দিয়ে কিছু বাণিজ্যিক পণ্য কিনল এবং একদল বড় ব্যবসায়ীর সাথে বিশাল এক জাহাজে চেপে সমুদ্রযাত্রায় রওনা হলো।

বেশ কয়েক দিন শুধু নীল পানি আর আকাশ দেখার পর, হঠাৎ একদিন দূর থেকে চমৎকার একটা সবুজ দ্বীপ দেখা গেল। দ্বীপে সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটেছে, মিষ্টি ফলের গাছ বাতাসে দুলছে। অনেক দিন পর ডাঙা দেখে নাবিকদের আনন্দের আর সীমা রইল না। ক্যাপ্টেন বললেন, "চলো, আজ আমরা এই দ্বীপেই দুপুরের রান্না করব, অনেক দিন পর ভালোমন্দ খাওয়া যাবে আর একটু বিশ্রামও হবে।"

সবাই দ্বীপে নেমে কেউ কাঠ কুড়াতে গেল, কেউ রান্নার জন্য উনুন বানাল। সিন্দাবাদও একটা গাছের ছায়ায় বসে ঠাণ্ডা বাতাস উপভোগ করছিল। কিন্তু যেই না নাবিকেরা উনুনে আগুন জ্বালাল, অমনি ঘটল এক তাজ্জব কাণ্ড! পুরো দ্বীপটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। বড় বড় ঢেউ এসে চারপাশ ভাসিয়ে দিল।

আসলে ওটা কোনো মাটি বা দ্বীপ ছিল না! ওটা ছিল সমুদ্রের এক দানবীয় তিমি মাছ। শত বছর ধরে এক জায়গায় স্থির হয়ে ভেসে থাকায় তার পিঠে বালি আর মাটি জমে গাছপালা গজিয়ে গিয়েছিল। আগুনের ছ্যাঁকা খেয়ে তিমি বাবাজী আর স্থির থাকতে পারল না, সে এবার পানিতে ডুব দিতে শুরু করল!

"বাঁচাও! বাঁচাও! এটা দ্বীপ নয়, রাক্ষুসে মাছ!" বলে সবাই জাহাজের দিকে দৌড় দিল। কিন্তু সিন্দাবাদ জাহাজে ওঠার আগেই তিমিটি পুরোপুরি পানির নিচে চলে গেল। সিন্দাবাদ ধপাস করে আছাড় খেলেন উত্তাল সাগরে। ভয় পেয়ে জাহাজটি সিন্দাবাদকে ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। ভাগ্য ভালো, একটা বড় কাঠের তক্তা ভেসে ছিল। সেটাকে দুই হাতে শক্ত করে জাপটে ধরে সিন্দাবাদ ঢেউয়ের সাথে লড়তে লাগলেন।

কয়েক দিন সাগরে ভেসে থাকার পর এক তীব্র ঢেউ সিন্দাবাদকে এক অচেনা রাজত্বের তীরে এনে ফেলল। ওখানকার রাজার রাজকীয় আস্তাবলের রক্ষকেরা সিন্দাবাদকে উদ্ধার করে প্রাসাদে নিয়ে যায়। দয়ালু রাজা সিন্দাবাদের মুখে সব শুনে তাকে রাজ দরবারে চাকরি দেন। পরে একদিন বাগদাদের একটি জাহাজ সেই রাজ্যে নোঙর ফেললে সিন্দাবাদ নিজের পরিচয় দিয়ে তার ফেলে আসা মালামাল ফিরে পান এবং রাজার কাছ থেকে প্রচুর উপহার নিয়ে আবার বাগদাদে ফিরে আসেন।

২. দ্বিতীয় অভিযান: দানব পাখি ‘রখ’ আর হিরার উপত্যকা

প্রথম অভিযানের ভয় কেটে যাওয়ার পর সিন্দাবাদ আবার অস্থির হয়ে উঠল। ঘরে বসে আরামের জীবন তার ভালো লাগছিল না। সে আবার নতুন জাহাজে চেপে বসল। এবার জাহাজ গিয়ে থামল এক অপরূপ সুন্দর জনমানবহীন দ্বীপে। দ্বীপটি এত শান্ত ছিল যে সিন্দাবাদ একটা ফলের গাছের নিচে ঠাণ্ডা বাতাসে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

যখন তার ঘুম ভাঙল, সে দেখল সূর্য ডুবে যাচ্ছে। চারপাশ একদম নিঝুম। সিন্দাবাদ লাফিয়ে উঠে সমুদ্রের দিকে তাকাল এবং তার বুক কেঁপে উঠল—জাহাজ তাকে ফেলে চলে গেছে! সিন্দাবাদ কাঁদতে কাঁদতে দ্বীপের এক উচুঁ পাহাড়ে চড়ল। সেখান থেকে সে দূরে একটা বিশাল, চকচকে সাদা গোল জিনিস দেখতে পেল। কাছে গিয়ে হাত দিয়ে দেখল, ওটা মস্ত বড় এক গম্বুজ, কিন্তু তাতে কোনো দরজা বা জানালা নেই, গা-টা মসৃণ।

হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। সিন্দাবাদ ভাবল ঝড় আসছে। কিন্তু মাথার ওপরে তাকিয়ে দেখল—আকাশে কোনো মেঘ নেই, বরং একটা বিশাল পাখি ডানা মেলে উড়ে আসছে। তার ডানা এত বড় যে সূর্যের আলো ঢাকা পড়ে গেছে! সিন্দাবাদ মনে করতে পারল, সে বয়স্ক নাবিকদের কাছে গল্প শুনেছিল—এটা হলো রূপকথার দানব পাখি ‘রখ’ (Roc)। আর ওই সাদা গোল জিনিসটা হলো রখ পাখির ডিম!

পাখিটি এসে ডিমের ওপর বসল। সিন্দাবাদ এক দারুণ বুদ্ধি খাটাল। সে তার মাথার পাগড়িটা খুলে আলতো করে রখ পাখির বিশাল একটা পায়ের সাথে নিজেকে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। সে ভাবল, "পাখিটা যখন উড়ে যাবে, আমিও এই দ্বীপ থেকে পার পেয়ে যাব।"

পরদিন ভোরে রখ পাখি এক প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে আকাশে উড়াল দিল। সে এত উঁচুতে উঠল যে সিন্দাবাদের মাথা ঘুরতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে পাখিটি এক গভীর ও অন্ধকার উপত্যকায় নেমে এলো। সিন্দাবাদ চটপট নিজের বাঁধন খুলে একটা পাথরের আড়ালে লুকাল। পাখিটি একটা বিশাল সাপকে ঠোঁটে চেপে ধরে আবার উড়ে চলে গেল।

উপত্যকাটায় তাকিয়ে সিন্দাবাদের চোখ ছানাবড়া! চারদিকে বড় বড় হিরা আর জহরত চকচক করছে। কিন্তু সেই সাথে সেখানে কিলবিল করছে বিশাল সব অজগর সাপ, যা একটা আস্ত হাতিকেও গিলে খেতে পারে! দিনের বেলা সাপগুলো গুহায় লুকিয়ে থাকে আর রাতে বের হয়। সিন্দাবাদ ভয়ে এক গুহার মুখে পাথর দিয়ে বসে রইল।

হঠাৎ ওপর থেকে একটা বড় কাঁচা মাংসের টুকরো টুপ করে সিন্দাবাদের সামনে পড়ল। সিন্দাবাদ মনে করতে পারল, সে বড়দের কাছে শুনেছিল—এই হিরার উপত্যকা থেকে মানুষ হিরা সংগ্রহ করার জন্য পাহাড়ের ওপর থেকে মাংসের বড় টুকরো নিচে ফেলে। মাংসের নরম গায়ে হিরাগুলো আটকে যায়। আর পাহাড়ের বড় বড় বাজপাখি যখন সেই মাংসের লোভে উপত্যকায় নেমে আসে এবং মাংস নিয়ে পাহাড়ে ফেরে, তখন উপর থেকে শিকারিরা চিৎকার করে পাখি তাড়িয়ে মাংসের গায়ে লেগে থাকা হিরাগুলো সংগ্রহ করে।

সিন্দাবাদ আর দেরি না করে অনেকগুলো বড় বড় হিরা কুড়িয়ে নিজের পকেটে ও ব্যাগে ভরল। তারপর একটা মস্ত বড় মাংসের টুকরো নিজের পিঠের সাথে পাগড়ি দিয়ে বেঁধে চিত হয়ে শুয়ে রইল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক বিশাল বাজপাখি এসে মাংসসহ সিন্দাবাদকে নখ দিয়ে চেপে ধরে পাহাড়ের চূড়ায় তার বাসায় উড়ে গেল। পাহাড়ের ওপর শিকারিরা যখন বাজপাখিটিকে তাড়াল, তখন মাংসের আড়াল থেকে সিন্দাবাদকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে দেখে তারা ভূত দেখার মতো চমকে গেল! সিন্দাবাদ তাদের সব খুলে বলল এবং সেই হিরাগুলো নিয়ে অনেক ধনী হয়ে বাগদাদে ফিরে এলো।


৩. তৃতীয় অভিযান: একচোখা রাক্ষস ও চতুর সিন্দাবাদ

বাগদাদে এসে সিন্দাবাদ রাজকীয় জীবন কাটাতে পারত। কিন্তু সমুদ্রের প্রতি তার টান ছিল রক্তে। সে তৃতীয়বারের মতো সাগরে রওনা হলো। এবার এক ভয়ানক সমুদ্রঝড়ে তাদের জাহাজ পথ হারিয়ে ফেলল। জাহাজ গিয়ে ঠেকল ‘বানরদের দ্বীপে’। হাজার হাজার ছোট ছোট হিংস্র বানর এসে জাহাজটি দখল করে নিল এবং নাবিকদের ধাক্কা দিয়ে দ্বীপে ফেলে জাহাজ নিয়ে পালিয়ে গেল।

নাবিকেরা নিরুপায় হয়ে দ্বীপের ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা একটা বিশাল কালো রঙের প্রাসাদ দেখতে পেল। প্রাসাদের দরজা-জানালাগুলো ছিল হাতির দাঁতের মতো বড়। কোনো উপায় না দেখে তারা সেই প্রাসাদে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল।

রাত বাড়তেই এক বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। প্রাসাদের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল এক ভয়ংকর দানব! দানবটা দেখতে মানুষের মতো হলেও সে ছিল পাহাড়ের মতো উঁচু, গায়ের চামড়া কুচকুচে কালো আর তার কপালের ঠিক মাঝখানে ছিল মাত্র একটি বড় লাল চোখ (Cyclops)। দানবটির দাঁতগুলো ছিল বুনো শুয়োরের মতো লম্বা আর ঠোঁট ঝুলে ছিল উটের মতো।

দানবটি সিন্দাবাদ ও তার বন্ধুদের দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে একে একে সবাইকে হাত দিয়ে তুলে দেখতে লাগল কার গায়ে মাংস বেশি। সবশেষে সবচেয়ে মোটা নাবিকটিকে ধরে সে একটি লোহার শলাকায় গেঁথে আগুনে পুড়িয়ে টপ করে খেয়ে ফেলল! তারপর এক বিকট নাক ডেকে ঘুমাতে লাগল।

সবাই ভয়ে কাঁদছিল, কিন্তু সিন্দাবাদ বলল, "কেঁদে লাভ নেই, আমাদের বুদ্ধি খাটাতে হবে।" সিন্দাবাদ প্রাসাদের এক কোণে থাকা একটি লম্বা লোহার রড খুঁজে বের করল। তারপর সবাই মিলে সেই রডটি আগুনের কয়লায় দিয়ে লাল টকটকে করল। দানবটি যখন গভীর ঘুমে অচেতন, তখন সিন্দাবাদ আর তার সঙ্গীরা মিলে সেই গরম লোহার রডটি দানবের একমাত্র চোখে সজোরে ঢুকিয়ে দিল!

"আআআহ!" বলে দানবটি যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। সে অন্ধ হয়ে হাতড়ে হাতড়ে সবাইকে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু সিন্দাবাদরা চটজলদি প্রাসাদের বাইরে পালিয়ে গেল। পরদিন সকালে তারা গাছের ডালপালা দিয়ে একটা ভেলা বানিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়ল। অন্ধ দানবটি তার অন্য দানব বন্ধুদের ডেকে এনে পাথর ছুড়েও তাদের মারতে পারল না। কিন্তু বিপদ সেখানেও শেষ হয়নি; দ্বীপে এক বিশাল অজগর সাপ বাকি নাবিকদের গিলে খায়। সিন্দাবাদ নিজের শরীরের চারপাশে কাঠের তক্তা বেঁধে কোনোমতে অজগরের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেন এবং একটি পাশ দিয়ে যাওয়া জাহাজ দেখে সংকেত পাঠিয়ে উদ্ধার পান।

৪. চতুর্থ অভিযান: গুহার ভেতরের জীবন্ত কবর

চতুর্থ যাত্রায় সিন্দাবাদের জাহাজটি এক প্রচণ্ড সামুদ্রিক ঝড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সিন্দাবাদ ও তার কয়েকজন সঙ্গী সাঁতরে এক অজানা দ্বীপে এসে পৌঁছাল। দ্বীপের মানুষগুলো ছিল খুব সভ্য এবং অতিথি পরায়ণ। তারা সিন্দাবাদকে রাজার কাছে নিয়ে গেল। রাজা সিন্দাবাদকে এত পছন্দ করলেন যে, রাজ দরবারের এক অতি সুন্দরী ও ধনী মেয়ের সাথে সিন্দাবাদের বিয়ে দিয়ে দিলেন। সিন্দাবাদ তো মহাখুশি! সে ভাবল, এবার বুঝি চিরতরে এখানেই থিতু হওয়া যাবে।

কিন্তু কিছুদিন পর সিন্দাবাদ জানতে পারল সেই দেশের এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর নিয়ম। নিয়মটি হলো—যদি কোনো দম্পতির স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে একজন মারা যায়, তবে জীবিত অপরজনকেও মৃতদেহের সাথে এক বিশাল পাহাড়ি গুহায় জীবন্ত কবর দেওয়া হবে! সিন্দাবাদ তো শুনেই আঁতকে উঠল।

ভাগ্যের পরিহাস, বিয়ের মাত্র কয়েক মাস পরই সিন্দাবাদের স্ত্রী এক কঠিন রোগে মারা গেল। পুরো রাজ্যের মানুষ কান্নাকাটি করে সিন্দাবাদের স্ত্রীর মৃতদেহ সুন্দর কাপড়ে আর দামি গহনায় সাজাল। তারপর সিন্দাবাদকে এক পাত্র পানি আর সাতটি রুটি দিয়ে সেই গভীর অন্ধকার গুহার মুখে নিয়ে যাওয়া হলো। একটা বড় পাথর সরিয়ে সিন্দাবাদকে দড়ি দিয়ে সেই গুহার নিচে নামিয়ে দেওয়া হলো এবং ওপর থেকে মুখটি বন্ধ করে দেওয়া হলো।

গুহাটি ছিল একদম অন্ধকার এবং চারিদিকে শুধু কঙ্কাল আর লাশ। সিন্দাবাদ ভয়ে ও দুঃখে কাঁদতে লাগল। সে প্রতিদিন অল্প অল্প করে রুটি আর পানি খেয়ে বেঁচে রইল। এভাবে যখন তার খাবার শেষ হয়ে এলো, সে মৃত্যুর প্রহর গুনছিল।

এমন সময় হঠাৎ সিন্দাবাদ একটা খসখস শব্দ শুনতে পেল। সে অন্ধকারের মধ্যেই ভালো করে খেয়াল করল। বুঝল, ওটা কোনো মানুষ নয়, কোনো বন্য পশু (হতে পারে শিয়াল বা হায়েনা), যা গুহার ভেতরে ঢুকেছে। সিন্দাবাদ ভাবল, এই পশুটি নিশ্চয়ই কোনো না কোনো পথ দিয়ে গুহায় ঢুকেছে। সে গুটিগুটি পায়ে অন্ধকারেই পশুটির পিছু নিল।

কিছুদূর যাওয়ার পর সিন্দাবাদ দেখল এক চিলতে আলোর রেখা! হ্যাঁ, পশুটি পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল, যা দিয়ে বাইরে যাওয়া যায়। সিন্দাবাদ সুড়ঙ্গটি হাত দিয়ে খুঁড়ে বড় করে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো এবং দেখল সে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আছে! গুহার ভেতর থাকা মৃত মানুষদের সাথে দেওয়া সোনা-দানাগুলো সে আগেই পকেটে ভরে নিয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় সিন্দাবাদকে উদ্ধার করে বাগদাদে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

৫. পঞ্চম অভিযান: সমুদ্রের বুড়ো মানুষ ও দুষ্টু জাদুকর


সিন্দাবাদের গল্প তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সে নিজেকে এবার এক মস্ত বড় জাহাজের মালিক বানিয়ে আবার সাগরে বের হলো। বেশ কিছুদিন শান্তিতে কাটানোর পর তারা এক চমৎকার দ্বীপে এসে পৌঁছাল। দ্বীপে ছিল শুধু মিষ্টি পানির ঝরনা আর চমৎকার সব ফলের বাগান।

সিন্দাবাদ যখন দ্বীপের ভেতরের দিকে হাঁটছিল, তখন সে এক ঝরনার পাড়ে একজন খুব দুর্বল ও বৃদ্ধ মানুষকে বসে থাকতে দেখল। বুড়োটি কথা বলতে পারছিল না, শুধু ইশারা-ইঙ্গিতে সিন্দাবাদকে বোঝাচ্ছিল যে সে নদী পার হতে চায়, কিন্তু তার পায়ে শক্তি নেই।

দয়ালু সিন্দাবাদ ভাবল, "আহা! বেচারা বুড়ো মানুষ। একে সাহায্য করা উচিত।" সে সানন্দে হাঁটু গেড়ে বসল এবং বুড়োটিকে বলল তার পিঠে চড়ে বসতে। বুড়োটি চট করে সিন্দাবাদের কাঁধে উঠে বসল। কিন্তু কাঁধে বসামাত্রই বুড়োর চেহারা বদলে গেল! সে তার দুই পা দিয়ে সিন্দাবাদের গলা এমন শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল যে সিন্দাবাদের দম আটকে যাওয়ার জোগাড় হলো।

আসলে ওটা কোনো সাধারণ বুড়ো ছিল না, সে ছিল ‘সমুদ্রের বুড়ো মানুষ’ (Old Man of the Sea), এক জাদুকর। সে যাকে পাত্তা পেত, তার কাঁধে চেপে বসে সারা জীবন তাকে দাস বানিয়ে রাখত এবং শেষ পর্যন্ত খাটিয়ে খাটিয়ে মেরে ফেলত।

বুড়োটি দিন-রাত সিন্দাবাদের কাঁধে চড়ে বসে রইল। সিন্দাবাদ ঘুমালে সে লাথি মারত, আর সিন্দাবাদকে দিয়েই সব ফলের গাছ থেকে ফল পাড়িয়ে নিত। সিন্দাবাদের কাঁধ-পিঠ ব্যথায় ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু নামানোর কোনো উপায় ছিল না।

একদিন সিন্দাবাদ এক দারুণ বুদ্ধি বের করল। সে দ্বীপের এক কোণ থেকে অনেকগুলো পাকা মিষ্টি আঙুর পেড়ে এনে একটা পাথরের গর্তে রাখাল। তারপর পা দিয়ে চেপে আঙুর রস বের করে একটা পাত্রে ভরে রোদে রেখে দিল। কয়েক দিন পর সেই রস গেঁজে চমৎকার মদে পরিণত হলো।

সিন্দাবাদ বুড়োর সামনে গিয়ে সেই রস খুব মজা করে খাওয়ার ভান করল। লোভী বুড়োটি ইশারায় বলল, "আমাকে দাও! আমাকে দাও!" সিন্দাবাদ পাত্রটি বুড়োর মুখে তুলে দিল। বুড়োটি এক চুমুকে সবটুকু রস খেয়ে ফেলল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জাদুকরী মদের নেশায় বুড়োর মাথা ঘুরতে লাগল। সে খুশিতে গান গাইতে গাইতে সিন্দাবাদের কাঁধের ওপর নাচতে শুরু করল এবং আস্তে আস্তে তার পায়ের বাঁধন আলগা হয়ে গেল। সিন্দাবাদ এই মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় ছিল! সে এক ঝটকায় বুড়োকে পিঠ থেকে মাটিতে আছাড় দিল। তারপর একটা বড় পাথর নিয়ে তার মাথায় আঘাত করে তাকে চিরতরে খতম করল। এরপর সমুদ্রের তীরে এসে নিজের জাহাজে চড়ে আবার বাগদাদে ফিরে এলো সিন্দাবাদ।


৬. ষষ্ঠ অভিযান: রত্নখচিত নদী ও সেরেনডিপের রাজা

ষষ্ঠ অভিযানে সিন্দাবাদের জাহাজটি এক ভয়ানক পাহাড়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। এই পাহাড়টি ছিল এক বিশাল দ্বীপের অংশ, যেখানে এর আগে বহু জাহাজ ধ্বংস হয়েছে। সিন্দাবাদ ও তার অল্প কয়েকজন সঙ্গী দ্বীপে নামল। কিন্তু সেখানে কোনো খাবার গাছ ছিল না। একে একে সিন্দাবাদের সব সঙ্গী না খেয়ে মারা গেল, শুধু সিন্দাবাদ কোনোমতে বেঁচে রইল।

সিন্দাবাদ দ্বীপটি ঘুরে দেখার সময় একটা অদ্ভুত নদী দেখতে পেল। এই নদীটি সাধারণ নদীর মতো সমুদ্রে মিশে যায়নি, বরং একটি পাহাড়ের ভেতরের অন্ধকার গুহায় ঢুকে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নদীর তলদেশে বালুর বদলে চকচক করছে অমূল্য হিরা, চুনি, পান্না আর মুক্তো! আর নদীর তীরে পড়ে আছে দামি চন্দন কাঠ।

সিন্দাবাদ ভাবল, "এখানে বসে না খেয়ে মরার চেয়ে এই নদীতে ভেসে ভাগ্য পরীক্ষা করা ভালো।" সে চন্দন কাঠ দিয়ে মজবুত একটা ভেলা বানাল। তারপর গুহার ভেতরের নদী দিয়ে ভাসতে ভাসতে যাওয়ার জন্য ভেলাটিতে প্রচুর দামি রত্ন বোঝাই করল।

ভেলাটি যখন পাহাড়ের ভেতরের অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকল, সিন্দাবাদ ভয়ে চোখ বন্ধ করে আল্লাহর নাম জপতে লাগল। সুড়ঙ্গটি ছিল খুব সরু আর অন্ধকার। কতক্ষণ সে এভাবে ছিল তার কোনো হিসেব নেই, ভয়ে সে একসময় অজ্ঞান হয়ে গেল।

যখন সিন্দাবাদের চোখ খুলল, সে দেখল সে এক চমৎকার খোলা জায়গায় ভেসে আছে, আর চারপাশ থেকে কিছু মানুষ তাকে দেখছে। এই জায়গাটি ছিল সেরেনডিপ (বর্তমান শ্রীলঙ্কা)। ওখানকার মানুষেরা সিন্দাবাদকে তাদের রাজার কাছে নিয়ে গেল। রাজা সিন্দাবাদের ভেলা আর রত্ন দেখে এবং তার অভিযানের গল্প শুনে ভীষণ খুশি হলেন। রাজা সিন্দাবাদকে রাজকীয় অতিথি হিসেবে রাখলেন এবং পরে বাগদাদের খলিফা হারুন-অর-রশিদের জন্য একটি মূল্যবান হাতি এবং অনেক উপহার দিয়ে সিন্দাবাদকে সসম্মানে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।

৭. সপ্তম অভিযান: হাতির কবরস্থান ও শেষ যাত্রা

ষষ্ঠ অভিযান থেকে ফেরার পর সিন্দাবাদ প্রতিজ্ঞা করেছিল সে আর কখনো সাগরে যাবে না। কিন্তু খলিফা হারুন-অর-রশিদ সিন্দাবাদকে ডেকে পাঠালেন। খলিফা বললেন, "সিন্দাবাদ, সেরেনডিপের রাজা আমাকে অনেক উপহার পাঠিয়েছেন। আমি চাই তুমি আমার দূত হয়ে কিছু মূল্যবান উপহার নিয়ে আবার সেরেনডিপের রাজার কাছে যাও।" খলিফার আদেশ তো অমান্য করা যায় না! তাই সিন্দাবাদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও সপ্তমবারে মতো সাগরে রওনা হলো।

সেরেনডিপে গিয়ে রাজার হাতে উপহার তুলে দিয়ে সিন্দাবাদ যখন বাগদাদে ফিরছিল, তখন একদল জলদস্যু তাদের জাহাজ আক্রমণ করল। জলদস্যুরা সবাইকে বন্দি করে এক দ্বীপে নিয়ে গেল এবং সিন্দাবাদকে এক হাতির শিকারির কাছে গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দিল।

সেই শিকারি সিন্দাবাদকে একটি বড় ধনুক আর তীর দিয়ে বনের একটা বড় গাছের ওপর বসিয়ে দিল। সে বলল, "প্রতিদিন হাতির দল এই গাছের নিচ দিয়ে যায়। তুমি তীর মেরে একটা হাতি মারবে। হাতি মরলে আমাকে খবর দেবে, আমি তার দাঁত কেটে নেব।"

সিন্দাবাদ প্রতিদিন গাছে বসে থাকত এবং তীর মেরে হাতি শিকার করত। একদিন এক বিশাল হাতির দল এসে সিন্দাবাদের গাছটি ঘিরে ফেলল। হাতির প্রধানটি তার শুঁড় দিয়ে গাছটি এমনভাবে ঝাকুনি দিতে লাগল যে সিন্দাবাদ ভয় পেয়ে নিচে পড়ে গেল। সিন্দাবাদ ভাবল এবার হাতিটা তাকে পিষে মেরে ফেলবে।

কিন্তু অবাক কাণ্ড! হাতিটি তাকে মারল না। সে সিন্দাবাদকে আলতো করে শুঁড় দিয়ে তুলে নিজের পিঠে বসাল এবং বনের গভীরে নিয়ে চলল। অনেক দূর যাওয়ার পর হাতিটি সিন্দাবাদকে এক বিশাল পাহাড়ের পাদদেশে নামিয়ে দিল।

সিন্দাবাদ তাকিয়ে দেখল, চারদিকে শুধু হাজার হাজার মরা হাতির কঙ্কাল আর বিশাল বিশাল হাতির দাঁত (Ivory) পড়ে আছে! সিন্দাবাদ বুঝতে পারল, এটা হলো হাতিদের কবরস্থান। হাতিরা তাকে বোঝাতে চাইল—"তোমরা হাতির দাঁতের জন্য আমাদের মারো তো? এই নাও, এখানে প্রচুর দাঁত আছে, আর আমাদের মেরো না।"

সিন্দাবাদ খুশি হয়ে শিকারির কাছে ফিরে গিয়ে সব জানাল। শিকারি সেখানে গিয়ে এত হাতির দাঁত দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। সে সিন্দাবাদকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিল এবং প্রচুর ধনসম্পদ উপহার দিল। সেই ধনসম্পদ নিয়ে সিন্দাবাদ খলিফার দরবারে ফিরে এলো এবং খলিফাকে পুরো ঘটনা শোনাল। খলিফা সিন্দাবাদের বুদ্ধির প্রশংসা করে তাকে অনেক বড় পুরস্কার দিলেন।

এরপর সিন্দাবাদ সত্যি সত্যিই সমুদ্রযাত্রা থেকে অবসর নিল এবং বাকি জীবন বাগদাদে তার পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সুখে-শান্তিতে কাটাতে লাগল।


শিক্ষণীয় বিষয়: সিন্দাবাদের এই ৭টি রোমাঞ্চকর গল্প আমাদের শেখায় যে—জীবন যতবারই আমাদের কঠিন বিপদে ফেলুক না কেন, ধৈর্য, সাহস আর সঠিক বুদ্ধির ব্যবহার করলে যেকোনো মুশকিল আসান করা সম্ভব!

কোন মন্তব্য নেই